সপ্তমী

ভট্টাচাজ্জিদের দূর্গা দালানে পা রাখার জায়গা নেই আজ।থিক থিক করছে লোকজন চারিদিকে।সপ্তমীর পূজো শুরু হবে একটু পরেই।সপ্তমীর পূজো দেখার জন্যেই আজ ভিড় যেন উপচে পড়ছে উঠোনে।

প্রতিবছরের মতোই এবছরও কুমারী পূজোর আয়োজন করা হয়েছে।ওদের বাড়ির গৃহকর্মী কুমুদের ১০ বছরের মেয়েকে এবারে ওরা বেছে নিয়েছে কুমারী হিসেবে।কুমুদ বামন ঘরের বউ।তিনকুলে কেউ নেই নাকি তার।দশ বছর আগে এক দূর্যোগের রাতে গ্রাম ছেড়ে এসে ভট্টাচাজ্জিদের দালানে আশ্রয় নেয়।ভট্টাচাজ্জি গিন্নি ওর দূর্দশার কথা শুনে ওকে এবাড়ির গৃহস্থালির কাজে রাখেন। দেখতে দেখতে দশটা বছর পার হয়ে গেছে।ওরা মা মেয়ে এই বাড়ির সবাইকে আপন করে নিয়েছে।

  • কুমুদ, নতুন বৌকে আলতাটা জলদি দিয়ে আয়,বেলা যে বয়ে যায়
  • আজ্ঞে, কর্তামা এক্ষুনি দিয়ে আসছি

কুমুদের মেয়েকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হল। ফুলের সাজ, কপালে সিঁদুর, চন্দনের কলকায় কুমুদের মেয়েকে আজ ছোট্ট দূগ্গাই লাগছে বটে!

আলতার বাটি হাতে নিয়ে তড়িঘড়ি করে কুমুদ এলো।ভট্টাচাজ্জিবাবুর নতুন বৌমা মালিনী তুলি দিয়ে কুমুদের মেয়ের পায়ে আলতা পরাতে পরাতে জিঞ্জেস করল

  • আচ্ছা কুমুদদি তোমার মেয়ের নাম সপ্তমী কেন রেখেছিলে?
  • আজ্ঞে বৌদিদি ও হল আমার সপ্তম গর্ভের সন্তান।এর আগে আমার তিনখানা মেয়ে হয়েছিল তাদের কেউই বাঁচেনি। শ্বশুরবাড়ির লোকজন খুব অত্যাচার করত পোয়াতি অবস্থায়। অপুষ্টিতে তিন মেয়েই মারা যায়। একবেলাও খাওয়া দিতো না ঠিকমতো ওরা আমাকে। বুকের দুধও শুকিয়ে গেছিল…

একটু থেমে চোখের জল মুছে কুমুদ আবার বলতে শুরু করল….

  • আবারও আমি পোয়াতি হলাম।ছেলে না হলে মেরে ফেলবে এই হুমকি দিতো আমাকে ওরা
  • ওমা সেকি! এঁরা কি মানুষ?
  • না গো বৌদিদি ওদের থেকে বনের পশুও অনেক ভালো মনে হয়!পরপর দুবার আবারও মেয়ে হল আমার।দুজনকেই চোখের সামনে ওরা পাতকুয়ায় ফেলে মারে।আমাকে ঘরবন্দী করে নির্যাতন করত শ্বশুরবাড়ির লোকজন। আমার স্বামীও নেশাভাঙ করে এসে শারীরিক নির্যাতন করতো।যখন বুঝলাম আমি আবারও পোয়াতি, পালানোর ছক কষতে থাকলাম ওখান থেকে নাহলে ওরা সপ্তমীকেও মেরে ফেলত। একদিন সুযোগ পেয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আসলাম এই মফঃস্বলে।পথে পথে ঘুরে ভিক্ষা করে যা পেতাম খেতাম, গাছতলায় থাকতাম।এক দূর্যোগের রাতে আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে তোমাদের দূর্গা দালানে ঠাঁই নিই। সেইরাতে এখানেই জন্ম হয় আমার মেয়ের।পরেরদিন সকালে কর্তামা আমার মুখে সব শুনে আমাদের এই ভিঁটেতে আশ্রয় দেন।কর্তামা না আশ্রয় দিলে আমরা মা মেয়ে আজ কোথায় যেতাম জানি না….

ভট্টাচাজ্জি গিন্নি ততক্ষণে কুমুদের পাশে এসে বসেছেন।কুমুদের চোখের জল মুছিয়ে তিনি বললেন,

  • তুই তো হলি পাঁকে ফোঁটা একখানা শ্বেতশুভ্র পদ্ম। আশেপাশে যতোই পাঁক থাকুক তুই সাদা পাঁপড়ি মেলে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিস।তিন কুলে কেউ নেই তোর, সেটা জেনেও শুধু পেটের সন্তানকে বাঁচাতে নিজের গাঁ ছেড়েছিলি।সব দূর্যোগকে জয় করে মেয়ের জন্ম দিলি এই দূর্গাদালানে। মায়ের পায়ের কাছে যে শ্বেতপদ্ম এসে পরেছে তাকে ফেলার সাধ্যি আমার নেই!তোর মেয়ে সপ্তম গর্ভজাত তাই সাধ করে ওর নাম দিয়েছিলাম সপ্তমী‌।দূর্গা মা তো সেদিন কুমারী রুপে আবার জন্ম নিলেন আমাদের দালানে।যে নির্দয় সমাজ কন্যাদের তাচ্ছিল্য করে,নির্যাতন করে,হত্যা করতে পিছপা হয়না, আজ তারাই শয়ে শয়ে এসেছে দেবীকে কুমারী রুপে অর্চনা করতে।তোর মেয়ে সবরকম অশুভ শক্তিকে হারিয়ে তোর মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে এসেছে।তোর মেয়েই তো আসল দেবী।

তোর নামের অর্থ শ্বেতপদ্ম।তুই তো শত ঝড় ঝাপটা সহ্য করে তোর কোমল পাঁপড়ি দিয়ে আগলে রেখেছিস তোর মেয়েকে।তোর কোলে মা আসতে চেয়েছিলেন তাই তোকে ঠিক পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলেন এই দূর্গাদালানে নিজের উপসনাস্থলে।আর স্বয়ং দেবী যদি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হতে চান তাকে আটকাবে কোন পুরুষ ?কোন সমাজ?

নিজেদের পশুত্বকে সংযত রেখে নারীকে সন্মান জানাতেই হয় কুমারী পূজো।তাই মহাষ্টমীর এই পবিত্র তিথিতে দেবীর অপরাজিতা রুপে আজ হবে তোর মেয়ে সপ্তমীর পূজো….

©️ Rim Paul Das

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!